সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম পে-স্কেল বা জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
নতুন এই বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গ্রেডভেদে সরকারি কর্মচারীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন বেতনস্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের বেতন কাঠামো আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বেতনস্কেলের তথ্য অনুযায়ী, ১ম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ করে বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এসব গ্রেডে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন বা প্রারম্ভিক মূল বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে ১২তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত নিচের দিকে যেতে যেতে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। ২য় গ্রেডে বর্তমান ৬৬ হাজার থেকে ৭৬ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। ফলে উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
৩য় গ্রেডে বর্তমান ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে ৯৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বাড়িয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪র্থ গ্রেডে বর্তমান ৫০ হাজার থেকে ৯১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা।
৫ম গ্রেডে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে নতুন কাঠামোয় ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা হয়েছে। ৬ষ্ঠ গ্রেডে বর্তমান ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬৭ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা
৭ম গ্রেডে বর্তমান ২৯ হাজার থেকে ৬৩ হাজার ৪১০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন নতুন কাঠামোয় বেড়ে ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে। ৮ম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ৪৭০ টাকা পর্যন্ত বর্তমান মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৬ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৮০০ টাকা।
৯ম গ্রেডে বর্তমান ২২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন নতুন বেতনস্কেলে বেড়ে ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা হয়েছে। ১০ম গ্রেডে বর্তমান ১৬ হাজার থেকে ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা।
১১তম গ্রেডে বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার ২৩০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে নতুন কাঠামোয় ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ১ম থেকে ১১তম—এই ১১টি গ্রেডেই প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ রাখা হয়েছে।
১১তম গ্রেডে বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার ২৩০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে নতুন কাঠামোয় ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ১ম থেকে ১১তম—এই ১১টি গ্রেডেই প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ রাখা হয়েছে।
এরপর ১২তম গ্রেড থেকে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার আরও বাড়ানো হয়েছে। ১২তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫ শতাংশ। এই গ্রেডে বর্তমান ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৭ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা।
১৩তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ। এই গ্রেডে বর্তমান ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। ১৪তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩০ শতাংশ। এ গ্রেডে বর্তমান ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা।
১৫তম ও ১৬তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৫তম গ্রেডে বর্তমান ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২৩ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা। ১৬তম গ্রেডে বর্তমান ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২২ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা।
১৭তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৮ শতাংশ। এই গ্রেডে বর্তমান ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা। ১৮তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১৩৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার ৩১০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা।
১৯তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪১ শতাংশ। এই গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫৭০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে নতুন কাঠামোয় হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা। সর্বশেষ ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা।
অর্থাৎ নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ উচ্চতর গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ রাখা হলেও নিম্নের গ্রেডগুলোতে ধাপে ধাপে বৃদ্ধির হার বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে তুলনামূলকভাবে কম বেতন পাওয়া সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতনে শতাংশের হিসাবে বেশি বৃদ্ধি হয়েছে।
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও এর আওতায় আসবেন। মন্ত্রিপরিষদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের সংস্থান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে নতুন বেতন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব নির্দেশনায় নতুন বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ধরনের ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান উল্লেখ থাকবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে। ফলে অনুমোদিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কার্যক্রম শুরু হবে।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেল নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বর্তমান বেতন কাঠামোর সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। নতুন বেতনস্কেল অনুমোদনের ফলে তাদের আর্থিক সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশারও অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেও প্রারম্ভিক মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা। বিশেষ করে ২০তম গ্রেডে ১৪২ শতাংশ এবং ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ফলে নিম্নগ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে। অন্যদিকে ১ম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে।
এখন অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও বিস্তারিত নির্দেশনা জারির পর নতুন বেতনস্কেল কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে এবং বিভিন্ন ভাতা ও পেনশনে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা আরও স্পষ্ট হবে। তবে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
🎁 Your Special Offer is Loading...
Please wait a moment. You'll be redirected automatically after the countdown.
⏳ Stay here — your offer will open shortly.
✅ You can go back to this page anytime.

Post a Comment